• জুন ১৬, ২০২১

এনজিওসহ বিভিন্ন সংস্থা রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তরে বাধা দিচ্ছে

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার নানা রকম চাপের কারণে রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তর প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে। কক্সবাজারের বিভিন্ন পাহাড়ে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা নাগরিকরা নানা রকম অপরাধে জড়াচ্ছে। মাদক কারবার, চাঁদাবাজি, ধর্ষণ- এমনকি প্রায়ই হত্যাকান্ড ঘটছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে। এ কারণে সরকার রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তরের চেষ্টা করছে। অনেক রোহিঙ্গা ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করে বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়ছে।

কিন্তু দেশি ও বিদেশি বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার ক্ষুণœ হওয়ার ভয় দেখিয়ে এদের ভাসানচরে যেতে নিরুৎসাহিত করছে। যদিও স্থানীয় প্রশাসন মনে করছেন, আসলে রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার রক্ষা নয়; এনজিওগুলো মূলত মনে করছে, কক্সবাজার থেকে সব রোহিঙ্গা স্থানান্তরিত হলে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো আর্থিক সহযোগিতা সংকুচিত করতে পারে। এতে এনজিওগুলোর কার্যক্রম গুটিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জানা গেছে, ২০১৭ সালের আগস্টে রোহিঙ্গা সমস্যা তৈরির পর সেখানে দেশি-বিদেশি ১৩৯টি এনজিও (বেসরকারি সংস্থা) কার্যক্রম শুরু করেছিল। পরবর্তীতে নানা অপকর্মে লিপ্ত থাকায় তালিকা করে ৪১টি এনজিওকে সেখানে নিষিদ্ধ করে সরকার। এরপরও এনজিওগুলোর অপতৎপরতা থেমে নেই। তারা নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে রোহিঙ্গাদেরও কক্সবাজারে রাখার চেষ্টা করছে।

মায়ানমার সেনাবাহিনী ও ধর্মীয় উগ্রপন্থিদের জাতিগত নিপীড়নের মুখে ২০১৬ সালের ৯ অক্টোবর এবং ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের ঢল নামে। সরকারি হিসাবে বর্তমানে নতুন ও পুরনো মিলিয়ে প্রায় ১১ লাখ ২০ হাজার নিবন্ধিত রোহিঙ্গা শরণার্থী কক্সবাজারে অবস্থান করছেন। সরকারি হিসাব অর্থাৎ নিবন্ধিত ছাড়াও বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা কক্সবাজার ও আশপাশের এলাকায় অবস্থান করছে। উখিয়া ও টেকনাফে ৩৪টি ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশ সরকার।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেন রোববার (১৫ নভেম্বর) রাজশাহী কলেজ পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘ভাসানচরে রোহিঙ্গা স্থানান্তরের দিনক্ষণ এখনও ঠিক হয়নি। কিন্তু কিছু এনজিও রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে যেতে নিরুৎসাহিত করছে। কিছু এনজিও ও বিদেশি সংস্থার চাপে এ স্থানান্তর প্রক্রিয়া বিলম্বিত হচ্ছে। তাদের জন্য যে আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে, তা খুবই উন্নতমানের। শীঘ্রই রোহিঙ্গাদের সেখানে স্থানান্তর প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।’

রোহিঙ্গা ইস্যুতে আগামীতে যুক্তরাষ্ট্রের যথেষ্ট সহযোগিতা পাওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ‘রোহিঙ্গারা এখন যেখানে আছে, সেখানে তিন বেলা খাচ্ছে, আর নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছে। ভাসানচর চমৎকার জায়গা। এখন পর্যন্ত ৩০৬ জনকে ভাসানচরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সেখানে বসবাস করা রোহিঙ্গা নারীরা কাজ শুরু করেছে। অনেক রোহিঙ্গা সেখানে যেতে ইচ্ছুক, তবে বেশকিছু এনজিও ও বিদেশি শক্তি তাদের ভাসানচরে যেতে নিরুৎসাহিত করছে।

READ  বিনিয়োগের বদলে নাগরিকত্ব: বাংলাদেশ থেকে কোন দেশে যেতে আগ্রহ বেশি?

জানা গেছে, বর্তমানে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নিবন্ধিত রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা ১১ লাখ ১৮ হাজার ৫৭৬ জন। এর মধ্যে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পরই মায়ানমারের সামরিক বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ ও নির্যাতন থেকে পালিয়ে বাঁচতে বাংলাদেশের কক্সবাজারে ঢুকেছে সাত লাখ ৪১ হাজার ৮৪১ জন। কক্সবাজারে রোহিঙ্গার সংখ্যা পুরো জেলার স্থানীয় মানুষের চেয়েও বেশি। স্বাভাবিক কারণেই বাড়তি জনসংখ্যার চাপে কক্সবাজারে দেশের নাগরিকদের জনজীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।সরকারি বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছেন রোহিঙ্গারা। প্রায় নানা রকম অপরাধমূলক কর্মকান্ডে লিপ্ত থাকার দায়ে গ্রেফতার হচ্ছে রোহিঙ্গা নাগরিকরা।

সম্প্রতি সরকারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভোটার নিবন্ধনে চার জেলার বিশেষ এলাকাগুলোতে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের পরও রোহিঙ্গারা অবৈধভাবে বিভিন্ন নাগরিক সুবিধা নেয়ার পাশাপাশি ভোটার তালিকার অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। রোহিঙ্গারা জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) গ্রহণের অপচেষ্টা করছে এবং বিভিন্ন রকম অপরাধমূলক কর্মকান্ডে লিপ্ত হচ্ছে। অনেক রোহিঙ্গা জালিয়াতি করে এনআইডি কার্ড বানিয়ে বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়ছে। অবৈধভাবে পাসপোর্ট নিয়ে কেউ কেউ বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে, সেখানে গিয়েও অপরাধে লিপ্ত হচ্ছে। এতে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে অপরাধমূলক কর্মকান্ড দিন দিন বেড়েই চলেছে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন না হলে স্বাভাবিকভাবে ওইসব এলাকায় সন্ত্রাসবাদের উত্থান হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা। খুন, ধর্ষণ, মাদক কারবার, শিশু পাচার, চুরি, ডাকাতি, অপহরণ, পতিতাবৃত্তিসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়াচ্ছে রোহিঙ্গারা। কক্সবাজারের দুই উপজেলার ৩৪টি ক্যাম্পে গত প্রায় তিন বছরে রোহিঙ্গাদের হাতে অর্ধশতাধিক রোহিঙ্গা নিহত হয়েছে। নভেম্বরের প্রথম দিকে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে উখিয়ায় কুতুপালং ক্যাম্পে দুই সন্ত্রাসী গ্রুপের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষে অন্তত ৭ জন নিহত হয়। রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে প্রায়ই সংঘাত-সংঘর্ষ হচ্ছে। বিশেষ করে মাদক কারবার, অস্ত্র ও স্বর্ণ ব্যবসা নিয়ে অভ্যন্তরীণ বিরোধ চরম আকার ধারণ করেছে।

READ  ৪২ ও ৪৩তম বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ

ভাসানচরে রোহিঙ্গা স্থানান্তর নিরাপত্তা ঝুঁকি ও জায়গার সংস্থান না হওয়ায় সরকার কক্সবাজারে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের নোয়াখালীর ভাসানচরে স্থানান্তরের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। গত বছরের মার্চে বাংলাদেশ সরকারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানায় জাতিসংঘ। তবে রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তর করা হলে সেখানে বসবাসের জন্য কী ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকবে- তা সরকারের কাছে জানতে চায় সংস্থাটি। এরপর পররাষ্ট্রমন্ত্রী গত বছর একাধিক অনুষ্ঠানে বলেন, রোহিঙ্গারা ভাসানচরে গেলেও সংকটের শেষ হবে না। এটি হবে সাময়িক সমাধান। বর্ষায় ভূমিধসের আশঙ্কার কথা মাথায় রেখে প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে পাঠাতে চেয়েছিলেন। সেখানে রোহিঙ্গারা গেলে তাদের রুজি-রোজগারের ব্যবস্থা হতো।

এনজিওগুলোর সমালোচনা করে ওই সময় পরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গারা ভাসানচরে যেতে রাজি হয়নি। এ বিষয়ে এনজিওরা বাধা দিয়েছে। কারণ সেখানে তাদের জন্য ফাইবস্টার হোটেলের ব্যবস্থা নেই। নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তর করতে চররক্ষা বাঁধসহ তিন হাজার ৯৫ কোটি টাকার একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে। অথচ গত এক বছরে কোন রোহিঙ্গাকে সেখানে স্থানান্তর করা সম্ভব হয়নি, জোয়ার-জলোচ্ছ্বাস থেকে এই চরের ৪০ বর্গকিলোমিটার এলাকা রক্ষা করতে বাংলাদেশ নৌবাহিনী ১৩ কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁধ তৈরি করেছে। এক লাখ রোহিঙ্গার জন্য সেখানে ১২০টি গুচ্ছ গ্রামের অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে।

রোহিঙ্গা নেতারা বলছেন, ভাসানচরে আসার জন্য তারা বাংলাদেশে আসেননি। তার চেয়ে বরং নিজ দেশে ফিরে যেতে চান তারা। তাছাড়া চরটি দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের জন্য উপযোগী কিনা তা নিয়ে ভাবা হচ্ছে আন্তর্জাতিক মহলে। সব মিলিয়ে বিষয়গুলো নিয়ে এখনও পর্যবেক্ষণ করছেন রোহিঙ্গা মাঝি বা ক্যাম্প নেতারা। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ভাসানচরকে রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপদ আবাস হিসেবে গড়ে তুলতে অন্তত ৫৫টি বিষয় সুরাহা করা উচিত বলে মত দিয়েছিল জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলো। এর মধ্যে রয়েছে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসসহ বিভিন্ন ধরনের দুর্যোগে সুরক্ষার ব্যবস্থা থাকা। তাদের নিরাপত্তা, খাবারের সরবরাহ, চিকিৎসা সেবাসহ জরুরি মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা। নৌপথে ভাসানচরে যোগাযোগের ব্যবস্থা অন্যতম। যদিও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে বলা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা ছাড়া ভাসানচরে প্রায় এক লাখ রোহিঙ্গার জন্য খাবার, স্বাস্থ্যসেবাসহ জরুরি মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করাটা কঠিন।

READ  পদ্মা সেতুর মূল কাঠামো দৃশ্যমান হবে ডিসেম্বরের মধ্যে

ভাসানচরে পুনর্বাসন প্রকল্প বাস্তবায়নের পর সরেজমিন দেখতে গত ৫ সেপ্টেম্বর দুই নারীসহ ৪০ জন রোহিঙ্গা প্রতিনিধি সেখানে যান। তারা সেখানকার সার্বিক পরিবেশ ও পরিস্থিতি দেখে জানিয়েছিলেন, তাদের জন্য সরকারের গড়ে তোলা অবকাঠামোগুলো মজবুত ও খুবই সুন্দর। মানুষের বসবাসের জন্য যেসব প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র দরকার সেগুলোও ভাসানচরে রয়েছে উল্লেখ করে রোহিঙ্গা নেতারা বলেছিলেন, ক্যাম্পে ফিরে যাওয়ার পর তারা অন্যদের বিষয়গুলো সম্পর্কে জানাবেন এবং বোঝাবেন।

কিন্তু তাদের তৎপরতার আগেই ভাসানচরে রোহিঙ্গারা যেন স্থানান্তর না হয়, তা নিয়ে টেকনাফ ও উখিয়ার ক্যাম্পগুলোতে শুরু হয় মিথ্যা প্রপাগান্ডা। নানা রকম বিভ্রান্তি ছড়ায় এনজিওগুলো। এর আগেও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে গঠিত যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের কর্মকান্ড নিয়েও ক্যাম্পগুলোতে মিথ্যা প্রপাগান্ডা ছড়ানো হয়।

রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের ইতিহাস: দেশে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশের ইতিহাস নতুন নয়। ১৯৭৮ সাল থেকে নিয়মিতভাবে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঘটছে বাংলাদেশে। সবচেয়ে বেশি রোহিঙ্গার প্রবেশ ঘটে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে। ওই বছরই প্রায় ৭ লাখ ৪০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বাংলাদেশ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় ও সুরক্ষা দিয়েছে।

এর আগে ২০১৬ সালে আরও প্রায় ৮০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এরও আগে বিভিন্ন সময়ে মায়ানমারে নির্যাতনের মুখে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আসে প্রায় ৩ লাখ রোহিঙ্গা, যা দশকের পর দশক ধরে কক্সবাজারে অবস্থান করছে। কেউ কেউ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ ও মায়ানমার সরকারের মধ্যে স্বাক্ষরিত দ্বিপক্ষীয় চুক্তি অনুসারে এরই মধ্যে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শেষ হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু মায়ানমার সরকারের উদাসীনতার কারণে তা শুরুই হয়নি।

admin

Read Previous

যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসীদের নাগরিকত্বের পরীক্ষায় যেসব পরিবর্তন এল

Read Next

শীতের আগে ত্বকের পরিচর্যা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *