• জুন ২৩, ২০২১

ডাক্তার-পুলিশ বিতর্ক ও মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান

সম্প্রতি সংঘটিত ডাক্তার-পুলিশ বিতর্ক নিয়ে চলছে অনেক রকম কথা, অনেক রকম আলোচনা সমালোচনা, তর্ক ও বিতর্ক। ছড়াচ্ছে বিভিন্নমুখী কথার ডালপালা। রঙ্গ-রস করছেন কেউ কেউ। তুলনা করছেন অন্য দেশের সাথে। এরকম একটি ঘটনা জাপানে হলে ডাক্তারের উক্তি কেমন হতো, পুলিশের উক্তি কেমন হতো? কেউ সমালোচনা করছেন পুরো ডাক্তার সমাজকে নিয়ে আবার কেউ সমালোচনা করছেন পুরো পুলিশ সমাজকে নিয়ে। মর্যাদাহানি হচ্ছে উভয় পেশাজীবীর।

এই মর্যাদা পুনরুদ্ধারের জন্য কেউ কেউ টেনে এনেছেন মহামারি করোনা পরিস্থিতিতে কোন পেশাজীবীর ভূমিকা কেমন এবং মুক্তিযুদ্ধকালে কোন পেশাজীবীর ভূমিকা কেমন ছিল। ডাক্তার সাহেব তো বারবার উচ্চারণ করেই বলছিলেন, আমি দেখিয়ে দিব ডাক্তার বড় নাকি পুলিশ বড়। অথচ উভয়পক্ষ সামান্য নমনীয়তা প্রদর্শন করলেই তৈরি হতো না এরূপ সমালোচিত পরিবেশ। শুধু ডাক্তার ও পুলিশ নয় প্রতিটি পেশার মানুষই অত্যন্ত সম্মানিত ও গুরুত্বপূর্ণ যদি তিনি পেশাগত দায়িত্ব-কর্তব্য সততার সঙ্গে সঠিকভাবে পালন করেন এবং সবার সাথে উত্তম ব্যবহার করেন।

ডাক্তার ও পুলিশের বিতর্কে অন্য যে বিষয়টি লক্ষণীয় ছিল সেটি হচ্ছে কার ক্ষমতা কতটুকু এবং ক্ষমতার শিকড় ও শিখর কতটুকু সেটি উপস্থাপন করা। অন্য সকল পরিচয়ের শেষে এসে উভয়পক্ষই নিজেদেরকে বীর মুক্তিযোদ্ধার উত্তরাধিকার হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন বারবার। বুক টান করে বলেছেন- আমি মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, আমিও মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। এটি ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা খেয়াল করেননি অনেকেই।

এতে পরিষ্কার বহিঃপ্রকাশ হয়েছে যে, বর্তমান বাংলাদেশে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান ও ক্ষমতা সর্বাধিক এবং মুক্তিযোদ্ধার পরিচয় একটা গৌরবের বিষয়। স্বাধীনতার প্রায় অর্ধ শতবর্ষ পরে আমরা আবার ফিরে পেয়েছি সেই গৌরব। অবশ্যই ধরে রাখার চেষ্টা করতে হবে তা। কোনভাবেই করা যাবে না এই সম্মান ও ক্ষমতার অপপ্রয়োগ। ভূলুণ্ঠিত হতে দেওয়া যাবে না এই মর্যাদা।

এমন এক সময় ছিল মুক্তিযোদ্ধার উত্তরাধিকার তো দূরের কথা মুক্তিযোদ্ধা নিজেই তাঁর পরিচয় দিতে চাইতেন না। অনুভব করতেন না মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কোনো সনদ সংগ্রহের ও সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা। ত্যাগের মহিমা বুকে ধারণ করে পড়ে থাকতেন চুপচাপ। কেননা, তারা ছিলেন সমাজের প্রায় অবহেলিত ও বঞ্চিত মানুষ। অবর্ণনীয় কষ্টে দিনাতিপাত করেছেন হাজারো মুক্তিযুদ্ধা। সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে উল্লেখযোগ্য পৃথক কোন মর্যাদা ছিল না বীর মুক্তিযোদ্ধাদের। ছিল না উল্লেখযোগ্য কোনো সুযোগ-সুবিধা।

READ  পদ্মা সেতুর রং ধূসর কেন

মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর তৈরি হয়েছিল তেমন পরিবেশ। সেই পরিস্থিতিতে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মপরিচয় গোপন করাই ছিল স্বাভাবিক। আজকের মত করে তখন কেউ বলতেন না আমি মুক্তিযোদ্ধা কিংবা আমি মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। কেননা, যে পরিচয়ে মর্যাদা থাকে না কেউ দিতে চান না সে পরিচয়। অথচ আজকে সগৌরবে পরিচয় দিচ্ছেন মুক্তিযোদ্ধা ও তার উত্তরাধিকারীরা। খুঁড়ে খুঁড়ে সংগ্রহ করছেন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের সামান্যতম প্রমাণ, সংগ্রহ করছেন মুক্তিযোদ্ধার সনদ। বিভিন্ন জায়গায় দাখিল করছেন সনদের কপি, জাহির করছেন নিজেদের পরিচয়।

বর্তমানে মুক্তিযোদ্ধারা সম্মানিত, পুরস্কৃত। মুক্তিযোদ্ধাদের উত্তরাধিকারও সম্মানিত, পুরস্কৃত। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা মুক্তিযোদ্ধাদের মাসিক ভাতা দিচ্ছেন, ভ্রমণ ও চিকিৎসা সুবিধাসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের উত্তরাধিকারদের জন্য কর্মসংস্থান করে দিচ্ছেন, দরিদ্র মুক্তিযোদ্ধাদের বাড়ি তৈরি করে দিচ্ছেন, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধাদের সম্মানিত করছেন, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের বিশেষভাবে সম্মানিত করছেন, মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্যদের সর্বত্র সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ মানুষে পরিণত করেছেন। ফলে তারা এখন আপন মহিমায় আত্মপরিচয় দিচ্ছেন। দীর্ঘদিন পর ফিরে পাওয়া এই সম্মান, এই মর্যাদা, এই ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের উত্তরাধিকারদের দায়িত্ব-কর্তব্য এখন অনেক বেশি।

কোনভাবেই অপব্যবহার করা যাবে না হারিয়ে পাওয়া এই মর্যাদা ও ক্ষমতার। কোনো অবস্থাতেই প্রদর্শন করা যাবে না দাম্ভিকতা। স্বার্থপর হয়ে বিনষ্ট করা যাবে না যুদ্ধকালীন ত্যাগের মহিমা। মুক্তিযোদ্ধার উত্তরাধিকার হিসেবে যারা পেয়েছেন বিভিন্ন পদ-পদবী তাদের পালন করতে হবে সর্বাধিক দায়িত্ব-কর্তব্য। সর্বত্র প্রমাণ করতে হবে সর্বোচ্চ সততা ও দেশপ্রেম।

জানতে হবে, মানতে হবে ও বলতে হবে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস। লালন করতে হবে, পালন করতে হবে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনা। মুখে নয়, কর্মে-কথায় বার বার প্রমাণ করতে হবে আমরা মুক্তিযুদ্ধার রক্তের উত্তরাধিকার। আমাদের যোগ্যতা, দক্ষতা, চিন্তা-চেতনা সবার চেয়ে অগ্রগামী। আমাদের আচার-ব্যবহার সবচেয়ে উত্তম। আমরা এদেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের শ্রেষ্ঠ উত্তরাধিকার। তা না হলে যত্রতত্র বিতর্কিত হবেন বীর মুক্তিযোদ্ধারা। আবার হারাবেন এতকাল পরে ফিরে পাওয়া এই সম্মান। যা মোটেও কাম্য নয়।

READ  করোনায় মারা গেলেন সাবেক মন্ত্রী চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ

মো. রহমত উল্লাহ্ : সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক ও শিক্ষক

Pial

Read Previous

বিদেশি ক্রিকেটারের জন্য অন্য দলের কাছে হাত পেতেছে রাজস্থান

Read Next

অনুমোদন পেল রাশিয়ার টিকা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *