• জুন ২৫, ২০২১

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মহিলা ছাত্রী

স্বপন সেন

বিদ্যাসাগর মহাশয়ের হাত ধরে বাংলায় নারী শিক্ষার প্রচলন হয়, এটা তো সবাই জানেন। কিন্তু এটা কি জানেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মহিলা ছাত্রী কে ? তিনি ছিলেন এই উপমহাদেশে নারী জাগরণের পথিকৃৎ !

বাবা ছিলেন বিচারপতি গিরীশ চন্দ্র নাগ। বেশি বয়সের সন্তান বলে আদর করে ডাকতেন ‘বুড়ি’। জন্ম ১৯০০ সালে আসামের গোয়ালপাড়ায়। প্রাথমিক শিক্ষা আসামেই, তারপর কলকাতায় এসে ভর্তি হন ব্রাহ্ম বালিকা বিদ্যালয়ে। ইতিমধ্যে বাবা অবসর নেওয়ায় পুরো পরিবার চলে আসে ঢাকায়। ১৯১১ সালে তিনি এসে ভর্তি হন ঢাকার ইডেন হাইস্কুলে। ম্যাট্রিক পরীক্ষায় রেকর্ড নম্বর পেয়ে কলকাতায় এসে ভর্তি হলেন বেথুন কলেজে।

পড়াশোনায় মেধাবী ছাত্রী তো ছিলেনই, সাথে নিয়মিত কাবাডি ও ব্যাডমিন্টন খেলতেন। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী মেয়েটি ছিল শিক্ষিকাদের প্রিয়ছাত্রী। সাথে ছিল এক প্রতিবাদী চরিত্র, কলেজে পড়ার সময়ে বড়লাটের পত্নীকে নতজানু হয়ে অভিবাদন জানানোর প্রথা বাতিলের আন্দোলনে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

১৯২১ সালে বেথুন কলেজ থেকে মেয়েদের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করে বি.এ পাশ করেন তিনি। লাভ করেন ‘পদ্মাবতী’ স্বর্ণপদক। ওই বছরেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজিতে এম.এ করার জন্যে দরখাস্ত করেন।

সেসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজা মেয়েদের জন্য ছিল বন্ধ। কিন্তু এই মেয়ে ছেড়ে দেবার পাত্রী নন। দরখাস্ত নিয়ে সটান দেখা করলেন আচার্য তথা বাংলার বড়লাটের সাথে। তার আগের পরীক্ষার ফলাফল এবং জেদ দেখে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার বিশেষ অনুমতি দিতে বাধ্য হলেন তিনি। সেই প্রথম মেয়েদের জন্য খুলে গেলো বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী থাকাবস্থাতেই তিনি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় ও ঋষি রামানন্দের সাহচর্য লাভ করেন। ১৯২৩ সালে তিনি ইংরেজিতে প্রথম বিভাগে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনিই ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম এমএ ডিগ্রিধারী নারী লীলাবতী নাগ। শিক্ষাজীবন শেষ করে লীলা নারীশিক্ষার প্রসার ও স্বাধিকার আদায়ের আন্দোলনে ব্রতী হন। নারীদের অশিক্ষার অন্ধকার থেকে মুক্ত করার জন্যে কয়েকজন সংগ্রামী সাথী নিয়ে গড়ে তোলেন ‘দীপালি সংঘ’। এই সংঘের মাধ্যমে তিনি দীপালি স্কুল ও আরও বারোটি অবৈতনিক প্রাইমারি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। নারীশিক্ষা মন্দির ও শিক্ষাভবন নামেও দু’টি স্কুল তিনি প্রতিষ্ঠা করেন।

READ  শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিতে লিগ্যাল নোটিশ

দীপালি সংঘ তৈরির আগে থেকেই লীলা বিপ্লবীদের সাথে জড়িয়ে গিয়েছিলেন। ১৯২৮ সালে কলকাতা কংগ্রেস ও বাংলার অন্যান্য বিপ্লবী দলগুলো সুভাষচন্দ্র বসুর চারপাশে সমবেত হতে থাকে, লীলাও উপস্থিত হন সেখানে। নিখিল ভারত মহিলা সম্মেলনে বাংলার নারী আন্দোলনের ইতিহাস বলার সময় লীলা মঞ্চে ওঠেন। তার বিপ্লবী জীবনের পথ এর মাধ্যমে প্রশস্ত হয়। নেতাজির অনুরোধে তার প্রকাশিত ইংরেজি সাপ্তাহিক ফরওয়ার্ড ব্লকের সম্পাদনার ভার নেন লীলা নাগ।

পরবর্তী কয়েক বছরের মধ্যে দীপালি সংঘের বৈপ্লবিক পরিবর্তন হতে থাকে। দলে দলে মেয়েরা এর পতাকাতলে সমবেত হতে থাকে। আসাম ও বাংলার বিভিন্ন স্থানে এর শাখা বিস্তৃত হতে থাকে। নারী সমাজের মুখপাত্র হিসেবে ‘জয়শ্রী’ নামে একটি পত্রিকাও বের করেন তিনি। ছাত্রীদের সুবিধার জন্যে কলকাতায় একটি মহিলা হোস্টেল তৈরি করান তিনি। বিপ্লবী নেত্রী লীলা নাগের কাছে দলের ছেলেরাও আসতেন নানা আলোচনার উন্মুখতা নিয়ে। প্রীতিলতার মতো সুপরিচিত নারী বিপ্লবীরাও এই দীপালি সংঘের মাধ্যমেই বিপ্লবের পাঠ নিয়েছিলেন লীলা নাগের কাছ থেকে। দীপালি সংঘ ছাড়াও অনিল রায়ের শ্রীসংঘের সাথেও যুক্ত ছিলেন তিনি। ১৯৩০ সালে সব বিপ্লবী দলের নেতাদের ইংরেজ সরকার একযোগে প্রেপ্তার করা শুরু করলে অনিল রায়ও প্রেপ্তার হন। ফলে শ্রীসংঘের দায়িত্ব পুরোটাই এসে পড়ে লীলার উপর।

শ্রীসংঘের সদস্যরা সশস্ত্র সংগ্রাম পরিচালনার জন্যে অস্ত্র সংগ্রহ ও বোমা তৈরির কাজ করতেন। বোমার ফর্মুলা নিয়ে কাজ করতেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের ছাত্র অনিল দাস ও শৈলেশ রায়। ১৯৩১ সালে বিপ্লবীদের কার্যকলাপ আরও জোরদার হয়। পরপর বেশ কিছু জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও জেলা জজ বিপ্লবীদের হাতে নিহত হন। এর মধ্যে কুমিল্লার জেলা জজ স্টিভেন্সের হত্যায় শান্তি সুনীতি ধরা পড়ায় পুলিশের সন্দেহ এসে পড়ে তার ওপরে।

১৯৩১ সালের বিশেষ ডিসেম্বর দীপালি সংঘের কাজ সেরে বাড়ি ফেরার পথে লীলা নাগকে গ্রেপ্তার করা হয়। তখন থেকে ১৯৩৭ সালের শেষ পর্যন্ত লীলা ঢাকা, রাজশাহী, সিউড়ী, মেদিনীপুর জেল ও হিজলী বন্দিশালায় আটক ছিলেন। ভারতবর্ষে বিনা বিচারে আটক হওয়া প্রথম নারী রাজবন্দী লীলা নাগ। পরবর্তীতে আরও অনেকবার কারাভোগ করতে হয় তাকে।

READ  শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মার্চে খোলার ইঙ্গিত সেতুমন্ত্রীর

১৯৩৯ সালে বিপ্লবী অনিল রায়ের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। বিয়ের পর লীলা কলকাতায় চলে আসেন এবং এখানেও বেশ কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এছাড়াও তিনি দীপালি ছাত্রী সংঘ ও মহিলা আত্মরক্ষা কেন্দ্রও গড়ে তোলেন। বিপ্লবী পুলিন দাসের নেতৃত্বে মেয়েরা এখানে অস্ত্র চালনা ও লাঠিখেলা শিখতেন।

দেশভাগের পর অনিল-লীলা দম্পতি পূর্ববঙ্গে বসবাসের উদ্যোগ নেন। পূর্ব বাংলার সংখ্যালঘু রক্ষা ও শরণার্থীদের পুনর্বাসনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন তারা। ১৯৫১ সালে পাকিস্তান সরকার প্রণীত উদ্বাস্তু উচ্ছেদের বিলের বিরোধীতা করে আবারও গ্রেপ্তার হন লীলা নাগ।

১৯৬৪ সালে পূর্ববাংলা বাঁচাও কমিটির আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার কারণে পুলিশ লীলা নাগকে গ্রেফতার করে। ১৯৬৬ সালে ছাড়া পাবার পর তিনি শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন। ১৯৬৮ সালে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তাকে কলকাতার পিজি হাসপাতালে এনে ভর্তি করা হয়। সংজ্ঞা ফিরে এলেও বন্ধ হয়ে যায় তার বাকশক্তি। শরীরের ডান অংশ সম্পূর্ণরুপে অচল হয়ে যায়। এভাবেই আড়াই বছর চলার পর ১৯৭০ সালের ১১ই জুন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের এই মহানায়িকা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্রী, উপমহাদেশের নারী সমাজের জাগরণের প্রথম অগ্রদূত, অগ্নিকন্যা লীলা নাগ পৃথিবী থেকে বিদায় নেন।

admin

Read Previous

কানাডায় বাংলাদেশিদের ডাটাবেস তৈরির কার্যক্রম শুরু

Read Next

যারা বই প্রকাশের জন্য মানুষ হত্যা করে, তারা সমাজ ও রাষ্ট্রের শত্রু’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *