• জুন ২৪, ২০২১

ফাস্টফুড রেস্তোরাঁয় মনকাড়া পরিবেশন

কথায় বলে, আগে দর্শনধারী, পরে গুণবিচারী। দেখার পর আকর্ষণবোধ করলেই তা নিয়ে কথা বলবে, স্বাদ নেবে; এটা মানুষের স্বভাবজাত। পণ্যের প্রতি ক্রেতাদের আকর্ষণ বাড়াতেও বিক্রেতাদের যেন ভাবনার শেষ নেই। অন্যদিকে সময়ের সঙ্গে বদলেছে মানুষের চাহিদা ও রুচি। তাই মুদিখানা থেকে পোশাক হয়ে ফাস্ট ফুড—প্রায় সব ক্ষেত্রেই ক্রেতার দৃষ্টি কাড়তে চলছে বিক্রেতাদের নানা উদ্ভাবনী উপস্থাপনার প্রতিযোগিতা।

সাম্প্রতিক সময়ে, বিশেষত করোনাকাল শুরুর পর থেকে ফাস্ট ফুড রেস্তোরাঁয় বাড়ছে ক্রেতার সংখ্যা; তাঁদের অধিকাংশই ফোনে অর্ডার করে সংগ্রহ করছেন পছন্দের খাবার। আগে শখ করে কিংবা বিশেষ দিনে বিশেষ আয়োজনে মানুষ ফাস্ট ফুড রেস্তোরাঁয় গেলেও বর্তমানে ফাস্ট ফুড রয়েছে চাহিদার তুঙ্গে। রেস্তোরাঁর আকর্ষণীয় নাম ও অভ্যন্তরীণ সজ্জা যেমন চোখে পড়ে, তেমনি ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে খাদ্য পরিবেশনের ধরন ও পদের ভিন্নতায়। রেস্তোরাঁর জাঁকজমক ও সাজসজ্জাই বলে দেয় কে কার আগে ভোক্তা আকৃষ্ট করতে পারে।

কিছুদিন আগেও দিনাজপুর শহরে হাতে গোনা কয়েকটি ফাস্ট ফুড ও চায়নিজ রেস্টুরেন্ট চোখে পড়লেও গত এক বছরে এই সংখ্যা বেড়ে তিন গুণ হয়েছে। দিনাজপুরে এখন চিলিস চায়নিজ রেস্টুরেন্ট, ইয়াম্মি চায়নিজ, জানাস কিচেন, মার্টিন চায়নিজ, রাজদরবার, দাওয়াত রেস্টুরেন্ট, রোলেক্স বিরিয়ানি, মামা বিরিয়ানি, স্কাই রেস্টুরেন্ট, চা সারাবেলা, সানন্দা বিরিয়ানি অ্যান্ড চায়নিজ, পাফিন চায়নিজ, হ্যাপি ট্রি, দিলশাদ রেস্টুরেন্ট, সরকার বাড়ি রেস্টুরেন্ট, খানাখাজানা, ড্রিম জোন, লগইন, বিস্ট্রো-ডিসহ ২৫টির বেশি প্রতিষ্ঠান ফাস্ট ফুড বিক্রি করছে।

শহরের গণেশতলা এলাকায় এক বছর আগে ৪ হাজার বর্গফুটের বিস্তৃত পরিসর নিয়ে গড়ে উঠেছে বিস্ট্রো-ডি। সন্ধ্যার পরে বাইরে থেকে হালকা রঙিন আলোর দেখা পাওয়া গেলেও পুরোটা বোঝার উপায় নেই ভেতরের মনোরম পরিবেশ সম্পর্কে।

খোলা আকাশের নিচে পাথর বিছানো, সেখানে ছোট ছোট চেয়ার-টেবিল। দুই সিট থেকে শুরু করে ছয় সিট পর্যন্ত। বারান্দার এক পাশে ম্যাট পাতা। তাতে রাখা আছে কুশন আর বালিশ। পারিবারিক পরিবেশে সেখানে বসে খাবার ব্যবস্থা। বিস্ট্রো-ডির পুরোটাজুড়ে আলোকসজ্জা। লাগানো হয়েছে কয়েক রকমের পাতাবাহারসহ ফুলগাছ।
সম্প্রতি এক সন্ধ্যায় মেয়ের আবদার রক্ষার্থে বিস্ট্রো-ডিতে আসেন শাহনাজ লোপা-সবুজ দম্পতি। মেয়ের পছন্দের খাবার ‘নাচোস’ আর মায়ের পছন্দ ‘মমোস’ খেতেই এখানে আসা। অর্ডার করার ১০ মিনিটের মাথায় চলে এল খাবার।

READ  পৃথিবীর গতি বাড়ছে, ২৪ ঘণ্টার আগেই শেষ হচ্ছে দিন!

ট্রের মধ্যে মাঝারি সাইজের একটি প্লেট। প্লেটের চারপাশে ছোট ছোট বাটি। বাটিতে রাখা হয়েছে বিভিন্ন রকমের বাহারী সস। আর প্লেটের মধ্যে সাজানো চিজের ওপর ছিটানো লাল-সাদা সস। গ্লাসে রাখা লেটুস পাতা। অন্য একটি প্লেটে গোলাকারভাবে সাজিয়ে রাখা হয়েছে ‘মমোস’। রাখা আছে শসা-গাজর, ক্যাপসিকাম কাটা। সেগুলো খাবারের ওপর নকশা করে সাজিয়ে রাখা। চারপাশে একইভাবে সসের বাটি। খাবার আগে একনজর দেখা। তারপর খাবার সঙ্গে নিয়ে একটি সেলফি। আর সঙ্গেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান দেওয়া।

শাহনাজ লোপা জানান, স্বামী-স্ত্রী উভয়েই চাকরির কারণে মেয়েকে সময় দিতে পারেন না। ছুটির দিনে প্রায় সময় মেয়েকে নিয়ে আসেন এখানে। কোলাহলমুক্ত পরিবেশ আর খোলা জায়গা পেয়ে মেয়েও স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে এখানে আসতে। সঙ্গে একেক দিন একেক রকমের খাবার খেতে পারেন।

সকাল থেকে শুরু করে রাত নয়টা। এসব রেস্টুরেন্টে পাস্তা, সাব স্যান্ডউইচ, বার্গার, ফ্রেঞ্চ ফ্রাইজ, মমোস, নাচোস, চাওমিন, পিৎজা, ফ্রায়েড চিকেন, চিকেন রোল, পটেটো ওয়েজেস, মাটন লেগ, সেট মেনু, চিকেন ললিপপ, চিকেন উইংস, চিকেন ফ্রাই, মাটন সিজলিং, মাটন কারি, মাটন তেহারি, কফি, সফট ড্রিংকসসহ নানা স্বাদের খাবার ও পানীয় মেলে। বিস্ট্রো-ডির মতো সব ফাস্ট ফুড রেস্তোরাঁয় প্রায় সব বয়সীরা ক্রেতা হলেও বিভিন্ন বয়সের শিক্ষার্থীদের আনাগোনাই বেশি। অনেকে বার্থ ডে পার্টিও করেন এসব রেস্টুরেন্টে। পরিবার নিয়ে আসেন কেউ। কেউ-বা গ্রুপ মিটিংয়ের আয়োজনও করেন। তবে অনেকেই অর্ডার করে বাড়িতে নিয়ে যান।

ফাস্ট ফুডের নিয়মিত গ্রাহক এম আবদুর রহিম মেডিকেল হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসক মো. সাব্বির হোসেন। পছন্দ করেন বারবিকিউ পিৎজা এবং চিকেন ললিপপ। তিনি বলেন, ‘ব্যস্ততার কারণে নিয়মিত বাড়ির খাবার খাওয়া হয়ে ওঠে না। তা ছাড়া ব্যাচেলর থাকি। তাই প্রায় সময়ই এসব ফাস্ট ফুড রেস্তোরাঁই একমাত্র ভরসার জায়গা হয়ে দাঁড়ায়। তা ছাড়া অর্ডার করলেই ২০ মিনিটের মধ্যেই খাবারটা পেয়ে যাই।’
বিস্ট্রো-ডির ব্যবস্থাপক ফারজানা ইয়াসমিন জানান, সাধারণত স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাই বেশি আসে। তবে ছুটির দিনগুলোতে পরিবার-বন্ধু সার্কেল আসে বেশি। এসব দিনে ১০-১৫টি পর্যন্ত পরিবার আসে। জানালেন, সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যকর পরিবেশে স্বাস্থ্যবিধি মেনে রেস্তোরাঁ পরিচালনা করছেন তিনি। তাঁর প্রতিষ্ঠানে পিৎজা, নাচোস এবং মমোসের গ্রাহক বেশি। মূলত বিকেল থেকে বন্ধ করা পর্যন্ত সময়ই সবচেয়ে ভিড় থাকে। মূলত কন্টিনেন্টাল ফুডই বিস্ট্রো-ডিতে বেশি বিক্রি হয়।

READ  বিয়ে নিবন্ধিত না হলে প্রমাণের উপায়

চায়ের বৈচিত্র্য
রং চা কিংবা দুধ চা পানে আমরা অভ্যস্ত। কিন্তু চা-সারাবেলায় মিলছে ককটেল চা, কাজুবাদাম চা, তন্দুরি চা, ক্ষীর আয়েশি চা, আচারী চা, দুই লেয়ার দুধ চা, দুই লেয়ার মসলা চা। চায়ের সঙ্গে আছে মুখরোচক টোস্ট বিস্কুট আর ভেলপুরি। দুজন, তিনজন কিংবা কখনো দল বেঁধে এসব চায়ে চুমুক দিতে আসছেন চা-বিলাসীরা।

দিনাজপুর শহরের কোতোয়ালি থানার পেছনে চেম্বার সড়ক। এই সড়কের ৩০০ গজের মধ্যে ছয়টি রেস্তোরাঁ। এর একটি চা-সারাবেলা। মাথার ওপরে খড়ের ছাউনি। চারদিক বাঁশ-খড়ের বেড়া দেওয়া। ছাউনির নিচে, বেড়ার মধ্যে খানিকটা দূরত্বে ঝুলন্ত হারিকেনের মৃদু আলো। বাঁশের চেয়ার-টেবিল। শীতের কুয়াশা আর গরম চায়ের উষ্ণতা যেন মিশে একাকার।

সকাল থেকে রাত নয়টা। চা-সারাবেলায় আড্ডা চলে। বিশেষত ছুটির দিনে এখানে বন্ধুদের আড্ডা জমে বেশ। ছোট ছোট মাটির কাপে চা পরিবেশন করা হয়। প্রতি কাপ চায়ের মূল্য সর্বনিম্ন ১০ থেকে শুরু করে ৫০ টাকা পর্যন্ত।

সামুদ্রিক মাছের পদ
ফিশ ফিঙ্গার, ফিশ মাসালা, ফিশ টিকিয়া, ফিশ বার্গার। রেস্তোরাঁ যেন এক টুকরো সমুদ্র। এখানে মিলবে সামুদ্রিক মাছের বৈচিত্র্যময় পদ। অন্যান্য খাবার থাকলেও এখানে মাছই প্রধান।

চেম্বার সড়কের মাঝ বরাবর মুখোমুখি রিলাক্স সি ফুড অ্যান্ড চায়নিজ রেস্টুরেন্ট ও ড্রিম ফুড প্যালেস। অর্ডার করলেই ৫০ থেকে ৪৫০ টাকার মধ্যে মিলছে মাছের সব সুস্বাদু পদ। দুটি রেস্তোরাঁয় ক্রেতার হাট। ড্রিম ফুড প্যালেসের স্বত্বাধিকারী ইসমাইল হোসেন বললেন, কয়েক দিন হলো রেস্তোরাঁটি উদ্বোধন করা হয়েছে। জানালেন, এরই মধ্যে তাঁর রেস্তোরাঁয় অন্যান্য খাবারের সঙ্গে ইরানি কাবাবের চাহিদা বেশি।
\

বর্তমানের এই ফাস্ট ফুড ট্রেন্ড নিয়ে কথা হয় দিনাজপুর হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুড প্রসেসিং অ্যান্ড প্রিভেনশন বিভাগের চেয়ারম্যান মারুফ আহমেদের সঙ্গে। তিনি বলেন, সময়ের সঙ্গে মানুষের রুচির পরিবর্তন হচ্ছে। এ ছাড়া ব্যস্ততার জন্য অনিচ্ছা সত্ত্বেও ফাস্ট ফুডের চাহিদা বাড়ছে। দিন দিন আরও বৃদ্ধি পাবে। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, ফাস্ট ফুড রেস্তোরাঁয় স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে খাদ্য তৈরি হচ্ছে কি না কিংবা রেস্তোরাঁর পরিবেশ স্বাস্থ্যকর কি না সেটা দেখা। সেই সঙ্গে দেখতে হবে উপকরণের মান। কারণ, মেয়াদ উত্তীর্ণ উপকরণ ব্যবহার মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ ছাড়া এসব খাবারে প্রচুর তেল থাকে; যা শরীরে ফ্যাট বাড়ায়, ফলে বাড়ে ওজন। এসব খাবার মুখরোচক। ফলে ছোটদের আবার শাকসবজি, ফলসহ সুষম খাবারের প্রতি আগ্রহ কমে। আহারে প্রোটিন ও ক্যালরির সমন্বয় হয় না। এতে রোগবালাই দেখা দেয়। তিনি বলেন, ফাস্ট ফুডের ওপর নির্ভরতা কমানো প্রত্যেকের দায়িত্ব।

READ  দূরে থেকেও সম্পর্ক টিকিয়ে রাখবেন যেভাবে

admin

Read Previous

বাড়বে শীতের অনুভূতি, থাকবে কুয়াশা

Read Next

হিংসুকের হিংসাই নিজের ধ্বংসের জন্য যথেষ্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *