• সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২১

বদনজরের বিষয়ে ইসলামের আক্বিদা বা বিশ্বাস

মানুষ সাধারণত একে অপরের কল্যাণকামী হবে এটাই স্বাভাবিক। তবে সবসময় সকলের ক্ষেত্রে এমনটি হয় না। সুস্থ স্বাভাবিক পরিবেশের পেছনে নিরবে কিছু ফিতনা চলে। যেমনঃ হিংসা, বদনজর, কালোযাদু ইত্যাদি। এসবকিছু সর্বকালেই কম-বেশি ছিল। তবে সময়ের এই ক্রান্তিকালে অন্যান্য ফিতনা যেমন বেড়েছে তেমনি এই ফিতনাগুলোও মহামারির রুপ নিয়েছে।

কিন্তু বদনজরের বিষয়টা আসলে কি? ইসলাম কি বদনজরকে সমর্থন করে? আজকের নিবন্ধের আলোচনার বিষয় সেটিই।

বর্তমানে অনেক শিক্ষিত মানুষই বদনজরের অস্তিত্বকে বিশ্বাস করতে চান না। কেউ তো বিজ্ঞানের দোহাই দেন, আবার কেউ কুসংস্কার মনে করে এটিকে উড়িয়ে দেন। যারা ইসলামে বিশ্বাস না করে বিজ্ঞানের দোহাই দিয়ে এসব অস্বীকার করেন তাঁদের জন্য আমাদের এই আলোচনা নয়। আমাদের আলাচনা হচ্ছে সেসব ঈমানদার ভাই ও বোনদের জন্য যারা এ ব্যাপারে সন্দিহান এবং ইসলাম এ সম্পর্কে কি আকিদা রাখতে বলে তা তারা জানেন না। এ কারণে আমরা কুরআন-সুন্নাহর আলোকে ‘বদনজর’ সম্পর্কে বিশুদ্ধ ইসলামী আক্বিদা নিয়ে আলোচনা করব।

বদনজরের সম্পর্কে হাদিস
১) আবু হুরায়রা রাযিঃ থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “বদনজর সত্য!” (বুখারী, মুসলিম)

২) আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযিঃ থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

“বদনজর সত্য, তাকদিরের চেয়েও আগে বেড়ে যায় এমন কিছু যদি থাকতো, তবে অবশ্যই সেটা হতো বদনজর! যদি তোমাদের বদনজরের জন্য গোসল করতে বলা হয় তবে গোসল করে নিও।” (মুসনাদের আহমাদ)

৩) জাবের রাযিঃ থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “আল্লাহর ফায়সালা ও তাকদিরের পর, আমার উম্মতের সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হবে বদনজরের কারণে!” (আবু দাউদ)

৪) আরেকটি হাদীস আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “তোমরা বদনজর থেকে আল্লাহর কাছে পানাহ চাও, কেননা বদনজর সত্য!” (তিরমিযী)

রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বিশুদ্ধ সনদে এমন আরও অনেক বর্ণনা পাওয়া যায়, যা প্রমাণ করে বদনজর সত্য, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

READ  দারিদ্র্য বিমোচনে ইসলাম কী বলে

বদনজরের সম্পর্কে কুরআন
১) সন্তানের প্রতি কুনজর
ইয়াকুব(আঃ) বললেন, “হে আমার সন্তানেরা! (শহরে প্রবেশের সময়) তোমরা সবাই একই দরজা দিয়ে প্রবেশ করো না, বরং পৃথক পৃথক দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে। আল্লাহর কোনো বিধান থেকে আমি তোমাদেরকে রক্ষা করতে পারব না, নির্দেশ একমাত্র আল্লাহরই চলে। তাঁরই উপর আমি ভরসা করি, আর ভরসাকারীদের একমাত্র তাঁর উপরই ভরসা করা উচিত।” (আল কুরআন-১২:৬৭)

অধিকাংশ মুফাসসির এই আয়াত প্রসঙ্গে বলেছেন,

“ইয়াকুব(আঃ) সন্তানদের ব্যাপারে বদনজরের আশংকা করছিলেন যে, উনার সন্তানদের দেখে লোকদের বদনজর লাগতে পারে। হয়তবা তাঁরা স্বাস্থ্যবান বা সুন্দর চেহারার অধিকারী ছিলেন। এজন্য সন্তানদের শহরে প্রবেশের সময় পৃথক পৃথকভাবে প্রবেশ করতে বলেছিলেন। পাশাপাশি এটাও উল্লেখ করে দিয়েছেন ‘এসব (বদনজর) তো আসলে আল্লাহর তৈরি একটি বিষয়, এখানে কাররই কিছু করার নেই। আল্লাহর ওপর ভরসা ছাড়া!”

২) সম্পদে নজর
যদি তুমি আমাকে ধনে ও সন্তানে তোমার চাইতে কম দেখো, তবে যখন তুমি তোমার বাগানে প্রবেশ করলে, তখন এ কথা কেন বললে না যে, আল্লাহ যা চান, শুধুমাত্র তাই হয়। আল্লাহ প্রদান না করলে কারও কোনো শক্তি নেই।” (আল কুরআন-১৮:৩৯)

এই আয়াতটিকে কুরআনের ব্যাখ্যাকাররা এ কথার প্রমাণ হিসেবে পেশ করেছেন যে, কোনো কিছু দেখে মুগ্ধ হলে সাথেসাথে মাশা-আল্লাহ, সুবহানাল্লাহ অথবা আলহামদুলিল্লাহ এসব বলতে হয়। যদি আলোচ্য আয়াতে উল্লেখিত ব্যক্তি নিজের বাগান দেখে মুগ্ধ হয়ে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতো, আল্লাহকে স্মরণ করতো তাহলে তাদের ঐ বাগান হয়ত নষ্ট হত না।”

আলোচ্য আয়াত থেকে এটাও প্রমাণিত হয় যে, নিজের বদনজর নিজের কোনো জিনিসের উপরও লাগতে পারে। নিজের সম্পদে বা নিজ সন্তানদেরও উপরও লাগতে পারে।

৩) লোকের দ্বারা ক্ষতি
“কাফেররা যখন কুরআন তেলাওয়াত শুনে, তখন তারা এমন ভাবে তাকায় যে মনে হয় তাদের দৃষ্টি দ্বারা যেন আপনাকে আছাড় দিয়ে ফেলে দিবে এবং তারা বলেঃ ও তো একজন পাগল!!” (আল কুরআন-৬৮:৫১)

READ  ইসলামে প্রবীণদের অগ্রাধিকার ও বিশেষ সুবিধা

এ আয়াত প্রসঙ্গে মুফাসসিররা লিখেছেন, এক লোক বদনজরের কারণে প্রসিদ্ধ ছিল। মক্কার কাফিররা ঐ লোকটাকে কোনো জায়গা থেকে নিয়ে এসেছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম যখন কুরআন পড়তেন, তখন ঐ লোকটা চেষ্টা করত রাসূলের উপর বদনজর দিতে। যখন কাজ হত না, তখন বলতো সে বলত, “ধুর! এই লোক তো পাগল (নাউযুবিল্লাহ)। এজন্য এর কিছু হচ্ছে না।”

এ থেকে এটি সহজেই বোঝা যায় যে, অনেক লোকের নজর খুব বেশি লাগে, আবার অনেকে এমন আছে যারা একটুতেই নজর দ্বারা আক্রান্ত হয়।

উপরের আলোচনা থেকে আশা করা যায় যে, বদনজরের বিষয়টিকে বিশ্বাস করা নিয়ে কারও কোনো অস্পষ্টতা নেই। এটা যদিও ইসলামের কোনো মৌলিক আকিদা না, যা ঈমানের সাথে সম্পর্ক রাখে। তবুও এরকম বিষয় যা কুরআন হাদিস দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত তা অস্বীকার করলে ঈমান তো কিছুটা হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আল্লাহ আমাদেরকে সঠিক বুঝ দান করেন। আমীন

admin

Read Previous

শীতের শেষে যেভাবে ত্বকের যত্ন নেবেন

Read Next

আযান শ্রবণের সময় কি করা উচিত?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *