• জুন ১৬, ২০২১

মসজিদের অতীত ও বর্তমান

বর্তমানে মসজিদগুলো কেবলই উপাসনার জন্য সাময়িক সময় ব্যবহৃত হয়। বাকি পুরো সময়টা তালাবদ্ধ পড়ে থাকে। অথচ ইসলামের যুগে এমন ছিল না। ইসলামের ইতিহাস বলে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের সময় থেকে মসজিদই ছিল সকল কাজের প্রাণকেন্দ্র। বলা বাহুল্য মসজিদের গুরুত্ব সেই সময় ছিল অপরিসীম।

একজন বিধর্মীও নিশ্চিন্তে মসজিদে নববীতে আসতে পারত এবং রাসূলের সাক্ষাত পেত। মুসলমানদের বাইতুল মালের কেন্দ্রও ছিল মসজিদ। সুষম খাদ্য বন্টন থেকে শুরু করে সকল সম্পদের সুষম বন্টন নিশ্চিত করা হত মসজিদ থেকে। তখন মসজিদ শুধুমাত্র মুসলমানের ‘উপাসনালয়’ নয়, বরং তা ছিল ইসলামী জীবনব্যবস্থা ও মুসলিম সভ্যতার প্রাণকেন্দ্র। ইসলামের সোনালি যুগে মসজিদ থেকেই পরিচালিত হত সমাজ ও রাষ্ট্রের যাবতীয় কাজ।

যেসকল কাজ তৎকালীন সময়ে মসজিদে নববী থেকে পরিচালিত হত তার কিছু নমুনা নিম্নে উল্লেখিত হল
১) জামাতে সালাত আদায়
নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত সালাত জামাত সহকারে মসজিদে অনুষ্ঠিত হত। মসজিদের যাবতীয় কাজের মধ্যে যেটিই সম্পূর্ণরূপে আজ অবধি অব্যহত আছে।

২) দৈনন্দিন তালিম ও সাপ্তাহিক খুতবা
প্রত্যহ ফজর ও আসরের সালাতের পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম উপস্থিত মুসল্লীদেরকে দ্বীনি তালিম ও ব্যবহারিক শিক্ষাসহ নানামুখি হেদায়েত দিতেন। এবং আর্থ-সামাজিক সার্বিক বিষয়ের উপর সাপ্তাহিক জুম’আর খুতবাতে মুসল্লিদেরকে সচেতন করে তুলতেন। পরবর্তীতে খোলাফায়ে রাশেদীনসহ সাহাবায়ে কেরাম এবং খলীফা ও মুসলিম উম্মাহর খতীবগণ একই পদ্ধতিতে মসজিদে মসজিদে এ তা’লিম ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা চালু রেখেছেন। এ আমলটিও বর্তমানকালে আংশিক অব্যহত আছে।

৩) দ্বীনের কাজে সার্বক্ষনিক সময়দানকারী সাহাবাদের বাসস্থান
এটি ছিল মসজিদের উত্তর কোণের বারান্দায়। তাদেরকে বলা হত আসহাবে সুফফা বা বারান্দার অধিবাসী। সার্বক্ষনিক যেকোনো কার্যক্রম বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আসহাবে সুফফার ভূমিকা ছিল মুখ্য।

৪) ইসলামী আন্দোলনের কেন্দ্র
রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম হিজরতের পর থেকে সার্বক্ষণিক কেন্দ্র হিসেবে মসজিদে নববীকে ব্যবহার করতেন। পরামর্শ, সিদ্ধান্ত, বাস্তবায়ন, কাফেলা প্রেরণ এক কথায় ইসলামের সাংগঠনিক যাবতীয় কর্মকান্ড মসজিদে নববী কেন্দ্রিক পরিচালিত হত। অথচ আমাদের সমাজে বর্তমানে ধারণা রয়েছে ‘মসজিদে দুনিয়াবী কথা বলা হারাম’

READ  তওবা মুমিন জীবনে সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনে

৫) মুসলিম উম্মাহর সভাকক্ষ
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম মসজিদে নববীকে ‘দারুন নাদওয়া’ বা পরামর্শ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করতেন। তিনি মুসলমানদের সাথে মসজিদে দ্বীন ও দুনিয়ার যাবতীয় বিষয়ে এবং বিশেষ করে যুদ্ধ ও শান্তি প্রতিষ্ঠার বিষয়ে পরামর্শ করতেন।

রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম মসজিদে থেকেই বিভিন্ন স্থান থেকে আগত প্রতিনিধিদলকে স্বাগত জানাতেন। প্রতিনিধিরা মসজিদের পার্শ্বে সওয়ারী বেঁধে মসজিদের খোলা অংশে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে সাক্ষাত করতেন।

৬) সমাজসেবা ও আশ্রয়কেন্দ্র
মসজিদ মুসলমানের জীবনে বিপদ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের মোকাবিলায় আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে কাজ করত। বিপদগ্রস্থ লোকেরা দলে দলে কিংবা একাকী মসজিদে এসে আশ্রয় নিত। এরকম কঠিন মুহূর্তে মুসলমানদের দায়িত্বশীলরা মসজিদে একত্রিত হয়ে দুর্যোগ মোকাবিলার উপায় বের করতেন।

তৎকালীন সময়ে মসজিদের সামাজিক ভূমিকা আরোও স্পষ্ট হয়ে ওঠে ইবনে জুবায়ের এবং ইবনে বতুতার মত বিশ্ব পর্যটকদের বক্তব্য থেকে। তাঁরা যখনই কোন নতুন দেশে গিয়েছেন, যেখানে তাঁদের কোনো পরিচিত লোকজন নেই, সেখানেই তাঁরা প্রথমে মসজিদে হাযির হয়েছেন। মসজিদে স্থানীয় লোকদের সাথে পরিচিত হওয়ার পর তাদের থাকা-খাওয়ার আর কোনো সমস্যা হয়নি। স্থানীয় লোকেরা পর্যটক আলেমদের সন্ধান পেয়ে অত্যন্ত আনন্দিত হতেন এবং কোনো কোনো সময় তো তাদের যোগ্যতা ও মর্যাদা মোতাবেক উপযুক্ত কাজে যোগদানেরও আহ্বান জানাতেন।

৭) আদালত
অতীতে মসজিদ আদালতের ভুমিকাও পালন করত। মসজিদ থেকে বিচারকের এমন ইনসাফপূর্ণ রায় ঘোষিত হয়েছে যা এখনও পর্যন্ত গোটা মানবতার বিচারের ইতিহাসে সোনালী অক্ষরে লিখিত আছে। মসজিদে বসেই বিচারক উটের রাখালের পক্ষে এবং আব্বাসী খলীফা মানসুরের বিরুদ্ধে ইনসাফপূর্ণ রায় ঘোষণা করেছিলেন। বিচারক খলীফার বিরুদ্ধে দরিদ্র-অসহায়-দিনমজুরের পক্ষে রায় ঘোষণা করতে কোনো পরোয়া করতেন না।

৮) ইসলামের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়
মসজিদে নববী ছিল ইসলামের প্রথম ইলম চর্চার কেন্দ্র। সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন এ বিশ্ববিদ্যালয়ের সুযোগ্য ছাত্র। তাঁরা মসজিদ থেকেই ইলম, হেদায়াত, ফজিলত ও শিষ্টাচার অর্জন করেছেন।

READ  আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে অন্যায় পরিহার করি

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- “যে আমাদের মসজিদে ভাল কিছু শিখতে কিংবা শেখাতে আসে, সে যেন আল্লাহর পথের মুজাহিদ।”

৯) আদর্শ ইসলামী পাঠাগার
মসজিদে নববী পাঠাগার হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে। ইসলামী বই-পুস্তক মসজিদে রেখে পাঠকদের চাহিদা পূরণ করা হত। সাধারণত ধনবান ও জ্ঞানী লোকেরা মসজিদে কিতাবাদি দান করতেন। পরবর্তীতে দেখা গেছে, খতীব আল-বাগদাদী নিজ কিতাবসমূহ মসজিদের জন্য ওয়াকফ করে গেছেন।

১০) হাসপাতাল ও দাতব্য চিকিৎসালয়
একসময় মসজিদ হাসপাতাল হিসেবেও সেবা দান করেছে। ইসলামের ইতিহাসে সংঘটিত যুদ্ধসমূহে মসজিদের একাংশকে যুদ্ধে আহত মুজাহিদ দের চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত হত। এর উত্তম উদাহরণ হল, গাযওয়া আহযাবে আওস গোত্রের নেতা আহত সা’দ বিন মু’আজকে চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সেবা দেওয়ার জন্য রসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম মসজিদে একটি তাবু কায়েমের নির্দেশ দেন। সেখানে তাঁর চিকিৎসা করা হয়।

উপরোক্ত আলোচনা থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, ইসলামের সোনালী যুগে মসজিদ সকল কর্মকান্ডের কেন্দ্ররূপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সময়ের ব্যবধানে বিভিন্ন অদূরদর্শী, স্বার্থান্ধ এবং গোত্রীয় আধিপত্যের প্রভাবে নীতিহীন শাসক, রাজ-রাজরাদের অনৈতিক কাজের সুবিধার্থে তারা প্রশাসনকে নিজেদের এখতিয়ারে নিতে প্রশাসনিক এবং সামাজিক নীতি নির্ধারনী কাজ গুলোকে পৃথক করে নিজস্ব গন্ডিতে আটকে ফেলে। যে প্রশাসনিক ভবনে, প্রাসাদে, রাজমহলে সাধারণদের প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত হয়ে পড়ে। জবাবদিহীতার বদলে রক্তচক্ষু এবং তাদের বাহিনীর তান্ডবে সাধারন মানুষ সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। অন্যদিকে তারা ধর্মীয় আবহের দোহাই দিয়ে মসজিদকে কেবলই উপাসনালয়ে পরিণত করে। যার ধারাবাহিকতায় আমরা সেটাকেই নিয়ম বলে মেনে আসছি।

admin

Read Previous

আযান শ্রবণের সময় কি করা উচিত?

Read Next

সবচেয়ে বড় সাইবার আক্রমণ: ৩২৭ কোটি মানুষের পাসওয়ার্ড হ্যাক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *