• জুন ২৪, ২০২১

কথা যখন অস্ত্রে পরিণত হয়

বাঙালির রাজনৈতিক জীবনের গতি পরিবর্তনকারী দিক নির্দেশন বঙ্গবন্ধুর ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণ। অলিখিত ১৮ মিনিটের এই ভাষণটি ছিল মূলত বাঙালির জন্য স্বাধীনতার ঘোষণা। ঐতিহাসিক এই ভাষণটি পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষণ হিসেবে ঠাঁই পেয়েছে জাতিসংঘ কর্তৃক স্বীকৃতির মাধ্যমে। ২০১৭ সালে ইউনেস্কো কর্তৃক ‘ওয়ার্ল্ভ্র হেরিটেজ ডকুমেন্ট’ হিসেবে আখ্যায়িত হওয়ার পর বিশ্ববাসীর কাছে এটি অনন্য মর্যাদা পেয়েছে। বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণ নিয়ে বহু গবেষণা হয়েছে। এর গুরুত্ব ও তাত্পর্য সম্পর্কে দার্শনিক ও রাজনীতিবিদরা বিভিন্নভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। তারা সবাই এই ভাষণটিকে অত্যন্ত মূল্যবান, অনুপ্রেরণাদানকারী ও তাত্পর্যপূর্ণ বলে ব্যাখ্যা করেছেন। এই ভাষণে ব্যক্ত হয়েছে

মানুষের মনের কথা। গণমানুষের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটেছে ৭ মার্চের ভাষণে। ভাষণ জুড়েই ছিল সাধারণ মানুষের অধিকারের কথা, মুক্তির কথা। পাকিস্তানি শোষকদের অন্যায় অবিচার, বৈষম্য বঞ্চনা, শোষণ নিপীড়ন থেকে মুক্তির জন্য কঠিন সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার সাহস ও মনোবল যুগিয়েছেন বঙ্গবন্ধু সর্বদা। এরই চূড়ান্ত নির্দেশনা ছিল ৭ই মার্চের ভাষণে। বাঙালি সেদিন বুঝে গিয়েছিল তাদের হারাবার কিছু নেই। কঠিন লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে এ দেশকে শত্রুমুক্ত করতে হবে। বাঙালির জীবনে এটি একটি বিশেষ স্মরণীয় দিন।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। কিন্তু পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শাসকগোষ্ঠী আওয়ামী লীগের হাতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হস্তান্তর না করে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয়ে বাঙালির আত্মবিশ্বাস অনেক গুণ বেড়ে যায়। অন্যদিকে, পাকিস্তান সরকারের বৈষম্যমূলক আচরণ ও টালবাহানায় বাংলার মানুষ তখন ভীষণভাবে ক্ষুব্ধ। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চ, ১৯৭১ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করলেও অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে ১ মার্চ ১৯৭১

অনির্দিষ্টকালের জন্য অধিবেশন মুলতবি ঘোষণা করেন। এরই প্রতিবাদে পূর্ব পাকিস্তানে তীব্র আন্দোলন ও বিক্ষোভ শুরু হয়ে যায়। আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের আহবানে ২ মার্চ ১৯৭১ ঢাকায় এবং ৩ মার্চ ১৯৭১ সারা দেশে হরতাল পালিত হয়। বঙ্গবন্ধু ৩ মার্চ ১৯৭১ পল্টন ময়দানের এক বিশাল জনসভায় সারা পূর্ব বাংলায় সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এই বিক্ষোভ আন্দোলনের পটভূমিতে বঙ্গবন্ধু ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে সমবেত উত্তাল জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে জাতির উদ্দেশ্যে তার ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন।
৭ মার্চ ১৯৭১, ঢাকা শহর ছিল মানুষের শহর, মিছিলের শহর। পুরো ঢাকাসহ সারা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে উদ্বিগ্ন জনতা বাস-লঞ্চে কিংবা ট্রেনে চেপে এবং পায়ে হেঁটে আসতে থাকে রেসকোর্স ময়দানে। লক্ষ্য একটাই প্রিয় নেতা শেখ মুজিবের কথা শোনার। লাখো মানুষের ঢল রেসকোর্স ময়দানে। শাহবাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে পুরা রেসকোর্স ময়দান জন সমুদ্রে উত্তাল। যেন নিঃশ্বাস ফেলার সময় নেই কারো। সবার একটাই লক্ষ্য শেখ মুজিব কী নির্দেশনা দেবেন। কী ঘোষণা আসবে বাঙালির মুক্তিদাতা মহানায়কের কাছ থেকে—এই একই আকাঙ্ক্ষা সবার মনে। বিকাল ৩টা ২০ মিনিটে শুভ্র পাজামা-পাঞ্জাবির ওপর হাতকাটা কালো কোট পরে বাঙালির প্রাণপুরুষ, স্বাধীনতার

READ  এমপি পদ হারাচ্ছেন হাজী সেলিম

মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দৃপ্ত পদক্ষেপে মঞ্চে উঠে দাঁড়ান। সম্মুখে উদ্বিগ্ন উন্মুখ লাখো জনতা। বঙ্গবন্ধু চারদিকে ভালো করে দেখে নিলেন একবার। তার প্রাণপ্রিয় জনগণ যাদের তিনি সবসময় বলতেন-আমার মানুষ, আমার ভাই। জয় বাংলা, জয় বাংলা ধ্বনিতে মুখরিত চারদিক। সমবেত জনতা ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা/ তোমার আমার ঠিকানা’ বলে স্লোগান, মুহুর্মুহ করতালি আর হাত নেড়ে অভিনন্দন জানাচ্ছে তাদের প্রিয় নেতাকে। স্লোগানে স্লোগানে গর্জে উঠছে রেসকোর্স ময়দান—‘শেখ মুজিবের পথ ধরো/ বাংলাদেশ স্বাধীন করো।’—‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো/ বাংলাদেশ স্বাধীন করো।’ ‘আমার দেশ তোমার দেশ/বাংলাদেশ বাংলাদেশ/, ‘স্বাধীন করো স্বাধীন করো/ বাংলাদেশ স্বাধীন করো’। সে এক অভাবনীয় দৃশ্য। সবাই অধীর আগ্রহে উন্মুখ বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনা সরাসরি পাওয়ার জন্য। প্রতিটি বাঙালিই যেন সেদিন মুক্তিযোদ্ধা, প্রতিটি

বাঙালির টগবগে রক্ত মুক্তির জন্য প্রাণ দিতে প্রস্তুত। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানে কী বলবেন—এটা নিয়ে সবারই ভাবনা ছিল। এ সংক্রান্তে বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বলেন, বঙ্গবন্ধু ৬ মার্চ সারা রাত ভেবেছেন। সংগ্রামী জনতার উদ্দেশ্যে তিনি কী কী বলবেন, তা তিনি ঠিক করতে পারছিলেন না। বঙ্গবন্ধু যখন ঘরময় পায়চারী করছিলেন তখন বেগম মুজিব বঙ্গবন্ধুর এই উদ্বিগ্নতা লক্ষ্য করে বলেছিলেন ‘যা বিশ্বাস করো তাই বলবে।’ বঙ্গবন্ধু তাই বলেছিলেন। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন। এই ভাষণটি ছিল জ্বলন্ত অগ্নিশিখার মতো, যার দাবানল প্রচণ্ড আবেগে ছড়িয়ে পড়েছিল সমগ্র বাংলায়। এই ভাষণ ছিল পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর নিপীড়ন-নির্যাতনে নিষ্পেষিত মুক্তিকামী মানুষের জন্য আলোকবর্তিকাস্বরূপ, যা স্বাধীনতা অর্জনের পথকে প্রশস্ত করে।

বাঙালি প্রজন্ম যুগের পর যুগ বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণকে তাদের দেশপ্রেম, কর্মোদ্দীপনা, জাতীয়তাবোধ ও আদর্শের মূলমন্ত্র বলে হূদয়ে ধারণ করে নেবে। যে ভাষণ শুনলে প্রতিটি বাঙালি উপলব্ধি করতে পারে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধের চরম সংকটময় পরিস্থিতি ও হাতের মুঠোয় প্রাণ নিয়ে প্রহর গোনা ক্ষণ। আন্দোলন-সংগ্রামের রক্তঝরা দিনগুলো ভেসে ওঠে চোখের সামনে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অলিখিত এই ভাষণ ছিল একটি কবিতার মতো, যার প্রতিটি শব্দ একটির সঙ্গে আরেকটি নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। প্রতিটি বাক্যের বিশ্লেষণ অতীব তাত্পর্যপূর্ণ। তার এই বক্তব্য প্রত্যেকটি মানুষকে দেশের মর্যাদা রক্ষা, অধিকার ও গণমানুষের দাবি আদায়ে আপসহীনতার নীতিতে উজ্জীবিত করে। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মকে দেশপ্রেমের বোধে উদ্বুদ্ধ করাসহ প্রবল আত্মপ্রত্যয়ী হতে এই বক্তব্য একটি বড় ম্যাজিক হিসেবে কাজ করে। একজন নেতার রাজনৈতিক দূরদর্শিতা প্রখর হলেই এরকম সাহসিকতাপূর্ণ ও আত্মবিশ্বাসী বক্তব্য প্রদান করা যায় !

READ  ভাসানচরের পথে ১৭৭৮ রোহিঙ্গা

Pial

Read Previous

৫জি এখন বাস্তব, গতি ১.৫ গিগাবাইট

Read Next

১১ বিঘা জমিতে আফিম চাষ, ৫ কৃষক গ্রেফতার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *